শনিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২২, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন

ব্রেকিং নিউজ :
জাতির পিতার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নড়াইলে প্রবাসী ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে চৌহালীতে ব্লক গ্রান্ট কো-অর্ডিনেশন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রৌমারীতে বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের বিক্ষোভ সমাবেশ রৌমারীতে বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিল ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করলেন জেলা প্রশাসন সুন্দরগঞ্জে ছাত্রলীগ/যুবলীগের বাঁধারমুখে জাতীয় পার্টির বিক্ষোভ সমাবেশ পন্ড অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উলিপুরে সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার না করায় ব্যবসায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা মাদারগজ ব্র্যাকের উদ্যোগে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

পাবনায় শিশু বিল্লাল হত্যা ও আসামীর আত্মহত্যা প্রচেষ্টা পুলিশের লোমহর্ষক অভিযান। নেপথ্য কাহিনী

Admin
  • আপডেট সময় : ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৯৯০ বার পঠিত

পাবনায় শিশু বিল্লাল হত্যা ও আসামীর আত্মহত্যা প্রচেষ্টা পুলিশের লোমহর্ষক অভিযান। নেপথ্য কাহিনী

 

আল্লাহ সহায় হন। পাবনা জেলা পুলিশ সুপারের দিক নির্দেশনায় এস পি কার্যালয়ের মনিটরিং সেল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের টিম চার দিন ও রাতের নির্ঘুম অক্লান্ত পরিশ্রমে ক্লু লেস ঘটনার রহস্যের উন্মোচন।

মঙ্গলবার (০৯ ফেব্রুয়ারী) রাত আনুমানিক ০৮ ঘটিকার দিকে জনৈক আফজাল হোসেন মীর সাং-শ্রীকোল, ইউপি-সাদুল্লাপুর, থানা-আতাইকুলা থানায় এসে অভিযোগ করেন যে, তার ছেলে বিল্লাল হোসেন মীর(১১) মাঝে মাঝে তার বাবার মটরচালিত ভ্যান চালাত। ঘটনার দিন দুপুর ০১টা থেকে ০১.৩০ টার দিকে কে বা কাহারা বিল্লালের ভ্যান রিজার্ভ করে নিয়ে যায় কিন্তু আর ফিরে না আসায় অনেক খোঁজাখুজির পর থানায় এসে জিডি করে।

পারিবারীক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিল্লাল স্থানীয় ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। তারা ০২ ভাই ০২ বোন। বড় ০২ বোন ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। ছোট ভাইয়ের বয়স ০৫ বছর। বিল্লালের বাবা আফজাল প্যারালাইসড হয়ে দুই পা প্রায় অচল। ০৪ ছেলে মেয়ের পড়াশোনা আর অভাবের সংসার চালানো নিয়ে বাবা আফজাল যখন চরম অসহায় হয়ে পরে তখনই দেবদূত হিসেবে হাজির হয় মাত্র ১১ বছর বয়সী বিল্লাল। দুই প্যারালাইসড পা নিয়ে বাবা ভ্যান চালাতে পারবে না তাই মটরচালিত ভ্যান নিয়ে বাবার পাশাপাশি শিশু বিল্লালও ভ্যান চালাতো। কিন্তু সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই ১১ বছরের শিশুর উপর
দৃষ্টি পরল হায়েনা পিশাচদের।

আতাইকুলা থানায় অসহায় পিতার অভিযোগের সূত্র ধরে পাবনা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান বিপিএম’র দিক নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আলম ক্লু লেস এ ঘটনার তদন্ত, শিশু বিল্লাল কে উদ্ধার কাজে নেমে পরেন। চারদিন রাত নির্ঘুম অক্লান্ত পরিশ্রম করে শিশু বিল্লালের লাশ উদ্ধার করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের অভিযানিক দল।

পুলিশ তদন্তে জানা যায়, একই গ্রামের দুই নেশাখোর মানুষ নামের অমানুষ নেশা করার এক পর্যায়ে তারা পরিকল্পনা করে যে, তারা শিশু বিল্লাল কে ফুসলিয়ে দুরে কোথাও নিয়ে ভ্যানটি বিক্রি করে দিবে। পরিকল্পনামত ঘটনার দিন ০১.০০-২.০০ টার দিকে ঘরের খুটির জন্য বাঁশ আনার কথা বলে বেশি টাকা ভাড়া দেওয়ার কথা বলে ভ্যান রিজার্ভ করে দুবলিয়া বেড়ি বাঁধের নির্জন জায়গায় নিয়ে যায়। কে জানে মনে মনে বিল্লাল কত না স্বপ্ন বুনেছিল। মা কে নতুন শাড়ি কিনে দিবে, ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া বড় বোন কে নুতন জামা দিবে আরও কত কি? কিন্তু তার সেই রঙ্গিন স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় যখন ২ জানোয়ার রুপী দানব কয়েক হাজার টাকার জন্য ভ্যান বিক্রি করার পরিকল্পনায় অবুঝ একমাত্র উপার্জনক্ষম এই শিশুটিকে হত্যা করে ক্যানেলের কচুরিপানার ভিতরে লুকিয়ে রাখে।

পাবনা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আলম শিশু বিল্লাল উদ্ধার ঘটনার বর্ননায় নিজের ফেসবুক স্টাটাসে অনুভুতি প্রকাশ করেন-

দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়া শিশু বিল্লাল হত্যা, সাংবাদিকতা এবং বেচারা পুলিশঃ

শিশু বিল্লাল এর নিখোঁজ এবং পরবর্তীতে ক্যানেলের কচুরিপানার ভিতর থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় কম-বেশী শিরোনাম ছিলো এরকমঃ “নিখোঁজের ০৪দিন পরে খালের পানিতে ভেসে উঠা লাশ উদ্ধার করল পুলিশ” সংবাদ গুলো দেখে তো আমার চক্ষু চরকগাছ।আসলে প্রকৃত ঘটনা ছিল লোমহর্ষক, প্রতিটি সেকেন্ড ছিলো মানসিক চাপ, ছিলো আশম্কা। পুলিশ ক্রাইম বিটে কাজ করা সংবাদকর্মী পুলিশের কাজের উপলব্ধি থেকে নিউজ করলে হেডলাইন এমন হতো না।

পাবনা জেলা পুলিশের WhatsApp গ্রুপে ঘটনা জানার পর আমি এবং ডিবির এসআই অসিত কুমার কাজ শুরু করে দেই। নিখোঁজ ছোট্ট ছেলেটাকে কে বা কারা নিয়ে গেছে, কেন নিয়ে গেছে এর কোন উত্তর নেই। ঘটনাস্থলে ও এর আশে পাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করলাম। সবগুলো একসাথে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আশার আলো খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমাদের গোয়েন্দা টিম চুরি হওয়া ভ্যানটির সন্ধান পেল। জাহাঙ্গীর নামক এক ব্যক্তি সদর থানার হাজীর হাট থেকে ভ্যানটি শ্রী কোলের বকুল শেখ এর নিকট থেকে ১০,০০০/- টাকায় কিনেছিল। আমরা সবাই বকুলের পিছনে দৌড়াতে লাগলাম। কিন্তু বকুল তো লাপাত্তা সাথে বকুলের মা ও। হঠাৎ বিদ্যুতের আলোর মতো সকল আশা এক ঝটকা দিয়েই নিভে গেল। কিন্তু পুলিশতো নাছোর বান্দা লেগে থাকলাম। ঐ রাতেই বকুলের মাকে এক দুর সম্পর্কের আত্মিয়ের বাড়িতে থেকে হেফাজতে নিলাম। বকুলের মায়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে, বকুরের শশুর বাড়ি নাটোরের গুরুদাসপুর। সেখানে তার ০২টা মেয়েও রয়েছে। কিন্তু নেশা করার কারনে প্রায় বছর খানেক হলো তার বউ ডিভোর্স দিয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি কাজে লাগানোর চেষ্টা করালাম। কিন্তু আশায় গুড়ে বালি মোবইল বন্ধ।
এ সময় পাবনা জেলার সন্মানিত পুলিশ সুপার জনাব মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান, বিপিএম স্যারের সাথে কথা বললাম। স্যারের একটাই কথা ছিল যেভাবেই হোক ছেলেটিকে জীবিত উদ্ধার করতে হবে। তখন সাত-পাঁচ না ভেবে ডিবির টিম নিয়ে দ্রুত গুরুদাসপুর রওনা করলাম। বকুলের শশুড় বাড়ি বাবলাতলা থেকে ৩/৪ কিঃমিঃ চলন বিলের ভিতরে হেটে যেতে হয়। সেখানকার গ্রাম পুলিশের সহায়তায় বকুলের শশুড়বাড়ি পৌছালাম। সেখানে বকুল ছাড়া আর সবাই ছিল। আমরা সবাই ক্ষিপ্ত মেজাজে ছিলাম। জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। কিন্তু কোন সদুত্তর নেই। তবে বকুলের শ্যালক শাহীন ছোট্ট একটা ক্লু দিল যে, তার মামাতো ভাই সেন্টু জানে বকুল কোথায় আছে। অতঃপর শাহীন কে সাথে নিয়ে তৎক্ষনাত চাঁচকইর সেন্টুর বাড়ীতে যাই কিন্তু বিধি বাম। এখানেও সবাই আছে শুধু সেন্টু ছাড়া। তখন ফজরের আজান দিয়েছে। একটু পরেই অন্ধকার ভেদ করে সূয মামা জেগে উঠবে আর আমাদের সকল আশা দূরাশায় পরিনত হবে। আমাদের টিমের লোকজন চরম হতাশায় নিমজ্জিত হলো। তখন বিদুৎ চমকনির মতো শাহীন বলে উঠলো যে, তার দুলাভাই বকুল আছে সেন্টুর আপন বোনের বাড়ি জায়গাটার নাম খেজুর তলা সিংড়ার মধ্যে পড়েছে। ০৬.৩০ ঘটিকার দিকে বকুলের শ্যালককে সাথে নিয়ে সকাল ০৮টার দিকে খেজুর তলা পৌছেই সেন্টুর বোন সাবিনার বাড়ি তল্লাশী শুরু করলাম। সাবিনা বকুলের কথা শুনেই রাগে অগ্নিমূর্তি ধারন করল। আমরা পৌছার আগেই সেন্টু সাবিনাকে ফোন করে বকুলকে সরিয়ে দিতে বলে। ফলে বকুলকে না পেয়ে আমাদের সবাই ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে হতাশায় ভেঙ্গে পড়ল। কিন্তু আমি ও এসআই অসিত কুমার বসাক হাল ছাড়লাম না। স্থানীয়দের সাথে কথা বললাম। হঠাৎ দেবদূতের মতো দেখা হলো পুলিশ কনস্টবল অচিন্ত কুমার মুকুটমনির সাথে। যে আমার সাথে কুড়িগ্রামের সদর সার্কেল থাকার সময় অফিসের মুন্সি ছিল। তার গ্রামের বাড়ী এই খেজুরতলায়। অচিন্তের বড় ভাই অসিত মুকুটমনি সচিব ছিলেন। অসিত মুকুটমনির জামাই সনাতন কুমার চক্রবর্তী যে আমাদেরই ২৮ তম পুলিশ ব্যাচের। যাই হোক মূহর্তের মধ্যে অচিন্ত ১০-১২টা মোটরসাইকেল যোগাড় করে বকুলের খুঁজে নেমে পড়ল। ঘন্টা দুয়েক পর অচিন্ত ফোন দিয়ে বলল, স্যার আসামী বকুল তার এক দূসম্পর্কের আত্মিয়ের ঘরে ঢোকার পর আমরা বাহির থেকে আটকিয়ে দিয়েছি। তারাতারি আসেন। জায়গাটা ছিল ধুলিডাংা খেজুরতলা থেকে প্রায় ৪০-৫০ মিনিটের পথ। খবরটা শুনে টিমের সবাই যেন ক্যারেন্টের শ্বক খাওয়ার মতো লাফিয়ে উঠলাম। মহা আনন্দে মাইক্রোতে উঠে রওনা দেওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে আবার অচিন্তের ফোন। ফোনের ওপাশ থেকে স্যার বকুল ঘরের ভিতর গলায় ফাঁস লাগানোর চেষ্টা করছিল আমার দরজা ভেঙ্গে উদ্ধার করেছি। তবে তার অবস্থা বেশ খারাপ। তখন মনে হচ্ছিল বিধাতা কি খেলা খেলছে আমাদের সাথে। অচিন্তকে আবার ফোন করে বলি যে, যত তারাতারি সম্ভব নাটোর সদর হাসপাতালে – আমরা আসছি। অচিন্ত সিএনজি যোগে সদর হাসপাতালে পৌছার পর পরই আমি পৌছেই ডাক্তারেনর সাথে কথা বলে ট্রিটমেন্ট শুরু করে দেই। ঘন্টা দুয়েক ট্রিটমেন্ট চলার পর ডাক্তার জানায় যে, Patient এখন শঙ্কামুক্ত। ঘন্টা খানেক পর আপনারা নিয়ে যেতে পারবেন। সকল অনিশ্চয়তা, চাকুরি হারানোর শঙ্কা আর ছোট বিল্লালের ভবিষ্যৎ হাজারো প্রশ্ন মাথায় কিন্তু ডাক্তারের কথা মাথায় রেখে কিছুই জিজ্ঞাসাবাদ করা যাচ্ছে না। এদিকে পাবনা আসতে আসতে রাত ১২.০০ টা পার হয়ে যায়।

টিমের সবাই তখন ক্লান্ত-শ্রান্ত। তারপরও রেষ্ট নেওয়ার সুযোগ নেই। বাসায় গিয়ে কোনমতে ফ্রেস হয়ে আবার আসি ডিবি অফিসে, সাথে সদর সার্কেল রোকনুজ্জামান এবং এসআই অসিত। এবার আট-ঘাট বেধে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি। জিজ্ঞাসাবাদে যা জানা গেল তাতে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরল। মাত্র ১০.০০০/- টাকার জন্য একজন নিষ্পাপ শিশুকে কেউ খুন করতে পারে তা বকুলের কাছ থেকে শোনার আগে বিশ্বাস হচ্ছিল না। যাই হোক রাতেই মৃত দেহ উদ্ধারের জন্য ভাড়ারা ইউনিয়নের দুবলিয়া বাঁধের ক্যানেলের পারে যাই কিন্তু প্রচন্ড কুয়াশার কারনে কোথায় লাশ লুকিয়ে রেখেছে পাসন্ড বকুল তা বুঝতে পারছিল না। তাই বাধ্য হয়েই ফিরে আসি এবং পরদিন অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারী সকাল ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে যাই এবং আসামীর দেখানো মতে কচুরিপানার ভিতর থেকে শিশু বিল্লালের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করি। এভাবেই সমাপ্ত ঘটে এক অপার সম্ভাবনাময় শিশুর জীবনাবসান, যে মাত্র ১০ বছর বয়সে পড়াশুনার পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়েছিল। এই ঘটনা ছিল প্রকৃত ঘটনা।

স্থানীয় কিছু পত্রিকা আর অনলাইন পোর্টাল গুলো পরের দিন বড় বড় লিড নিউজ করলো-

“নিখোঁজের ০৪ দিন পর খালের পানিতে ভেসে উঠা লাশ উদ্ধার করল পুলিশ”।
হায়রে বেচারা পুলিশ !!!!!নিজেদের পরিশ্রম আন্তরিকতার ও পেশাদারীত্বের ক্রেডিট তো হলোই না উল্টো বকুল যদি গলায় ফাস দিয়ে মারা যেত তখন চাকুরী ও যেত আর সাথে বোনাস হিসেবে জুটত লাঞ্চনা ……..।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.


এ্রই রকম আরো সংবাদ